গ্রেট ডিপ্রেশন (Great Depression): মার্কিন অর্থনীতি সহ সারা বিশ্বে যার ঢেউ আছড়ে পড়েছিলো

১৯২৯ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত শেয়ারবাজারের ধ্বস থেকে শুরু করে শিল্প ক্ষেত্রসহ মার্কিন অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে ধ্বস নেমেছিল। পশ্চিমা বিশ্ব সহ সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে মারাত্মক গ্রেট ডিপ্রেশন (Great Depression) বা মহামন্দা ছিল এটি। অর্থনৈতিক বিভিন্ন সংস্থাগুলিতে, সামষ্টিক অর্থনীতি এবং অর্থনৈতির মৌলিক তত্ত্বগুলো পরিবর্তন হতে শুরু করেছিলো।

যদিও এটি প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভূত হয়েছিল, তথাপি মহামন্দা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছিলো, বেকারত্ব বেড়ে গিয়েছিল চরমভাবে। প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই তীব্র মন্দাভাব পরিলক্ষিত হয়েছিলো। এর সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবগুলিও কম বিস্ময়কর ছিল না।

১৯২৯ সালের অক্টোবরে শেয়ারবাজার ক্রাশের পরে সাধারনত এ অবস্থার সূচনা হয়েছিল, যা ওয়াল স্ট্রিটকে আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। শেয়ার বাজারের এরকম একটি ধ্বস লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারীকে একেবারে পথে বসিয়ে দিয়েছিলো।

পরবর্তী কয়েক বছর ধরে, জীবনযাত্রার ব্যায় এবং সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি হ্রাস পায়। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়া সংস্থাগুলি তাদের শ্রমিকদের ছাটাই করায় শিল্প ক্ষেত্রে উত্পাদন ও কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছিলো। ১৯৩৩ সালের দিকে, গ্রেট ডিপ্রেশন (Great Depression) এর অবস্থা যখন সর্বচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন প্রায় ১.৫ কোটি আমেরিকান বেকার হয়ে পড়েছিল এবং আমেরিকার প্রায় অর্ধেক ব্যাংক একেবারেই দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিলো।

মহামন্দার কারণ কি ছিল?

Destitute_man_San_Francisco_CA_1935
Destitute_man_San_Francisco_CA_1935

১৯২০ এর দশকের পুরোটা সময় জুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি দ্রুত প্রসারিত হয়েছিল। ১৯২০ থেকে ১৯২৯ এর মধ্যে দেশটির মোট সম্পদ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিলো।

নিউ ইয়র্ক সিটির ওয়াল স্ট্রিটের, নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জকে কেন্দ্র করে পরিচালিত শেয়ারবাজারের অবস্থা ছিল একরকম বেপরোয়া। মিলিয়নিয়ার টাইকুন থেকে শুরু করে, গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত ব্যাক্তি এবং দারোয়ানসহ প্রত্যেকেই তাদের সঞ্চিত অর্থ স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ করেছিলো। ফলস্বরূপ, শেয়ার বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, এবং ১৯২৯ সালের আগস্টে আমেরিকান শেয়ার বাজারের মূলধন সর্বচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

সাধারন জনগণ শেয়ার বাজার সহ দ্রুত বর্ধনশীল আর্থিক খাতগুলোতে লাগামহীনভাবে আর্থ বিনিয়িগের ফলে, দেশের সার্বিক উৎপাদন হ্রাস পেয়েছিল এবং সেই সাথে বেকারত্ব বেড়ে যায়। ফলে শেয়ারের দাম প্রকৃত মুল্যের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায় এবং বাজার ক্রাশ করে। তদুপরি, সেই সময়ে শ্রমিক মজুরিও কম ছিল, ভোক্তাগণ বিলাসী পণ্যর দিকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকছিল।

খরার কারণে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পেতে শুরু করে। একই সময়ে খাদ্যের দাম হটাত করে কমে যাওয়ার কারণে কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতি, সার্বিক ব্যাবস্থাপনার সাথে লড়াই করে যাচ্ছিল এবং ব্যাংকগুলিতে অতিরিক্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছিল।

আমেরিকান অর্থনীতি ১৯২৯ সালের গ্রীষ্মে একটি মৃদু মন্দায় প্রবেশ করেছিল, কারণ মানুষজন তাদের কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছিল, ফলে বিক্রয় কেন্দ্রগুলিতে অবিক্রীত পণ্যর পরিমাণ বাড়ছিলো। এতে করে, কারখানাগুলো উত্পাদন কমিয়ে দিয়েছিল। এতদসত্তেও, শেয়ারের দাম বাড়তে থাকে, এবং সেই বছরের শেষের দিকে শেয়ার বাজার স্ট্র্যাটোস্ফেরিক স্তরে পৌঁছে যায় যা ভবিষ্যতের জন্য খুব একটা ভাল কিছু ছিল না।

বহির্বিশ্বে মহামন্দার ঢেউ

camden-crowds-photos-great-depression
camden-crowds-photos-great-depression

গ্রেট ডিপ্রেশন (Great Depression) বিশ্বের প্রতিটি দেশকে কার্যত প্রভাবিত করেছিল।  মহামন্দার ঢেউ সময়ের সাথে সাথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশকে যথেষ্ট পরিবর্তিত করতে সক্ষম হয়েছিলো। গ্রেট ব্রিটেনের অর্থনীতি ১৯২৫ পরবর্তী বেশিরভাগ সময়ধরে হ্রাস-বৃদ্ধির পাশাপাশি মন্দার সাথে লড়াই করে চলেছিল।

তবে ১৯৩০ এর গোড়ার দিকে দেশটি মারাত্মক চাপে পড়ে যায় এবং শিল্প উত্পাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেতে থাকে। এটি প্রায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক তৃতীয়াংশ ছিল। ১৯৩০ সালের প্রথমদিকে ফ্রান্স তুলনামূলকভাবে স্বল্প মন্দার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল।

১৯৩২ এবং ১৯৩৩ সালে ফরাসিরা এর থেকে পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চালালেও সেটা অবশ্য ক্ষণস্থায়ী হয়েছিল। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৬ সালের মধ্যে ফরাসী শিল্প উত্পাদন এবং উৎপাদিত পণ্যের দাম উভয়ই যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পেয়েছিল। ১৯২৮ সালের প্রথম দিকে জার্মানির অর্থনীতি, মন্দার দিকে চলে যায় এবং ১৯২৯ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিল। জার্মান শিল্প উত্পাদন হ্রাস পেয়েছিলো।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মহামন্দা শুরুর অল্প সময় আগে ১৯২৮ সালের শেষের দিকে এবং ১৯২৯ সালের গোড়ার দিকে লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ গ্রেট ডিপ্রেশনে পড়েছিল। কিছু স্বল্প-উন্নত দেশ তীব্র হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পরে, এবং অন্যান্য কিছু দেশ যেমন আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল, তুলনামূলকভাবে মৃদু গ্রেট ডিপ্রেশন (Great Depression) বা মহামন্দার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল। জাপানেও একটি হালকা মন্দাভাব অনুভুত হয়েছিলো সে সময়।

১৯২৯ এর স্টক মার্কেটে ধ্বস 

Unemployed_men_queued_outside_a_depression_soup_kitchen_opened_in_Chicago
Unemployed_men_queued_outside_a_depression_soup_kitchen_opened_in_Chicago

২৪ অক্টোবর, ১৯২৯-এ, একটু দ্বিধা দন্দে থাকা বিনিয়োগকারীরা তুলনামুলক বেশি মূল্যের শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করে। এর ফলে শেয়ারবাজারে একটি বড় ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় এবং এটা শেষ পর্যন্ত সেটা ঘটেছিলও। সেদিন রেকর্ড ১২.৯ মিলিয়ন শেয়ারের লেনদেন হয়েছিল, যা ইতিহাসে (Black Thursday) নামে পরিচিত।

এর পাঁচ দিন পরে, ২৯ শে অক্টোবর আরও একটি  (Black Tuesday) এর অবতারনা ঘটে, এবং এদিন ওয়াল স্ট্রিটে প্রায় ১৬ মিলিয়ন শেয়ার লেনদেন হয়। ফলশ্রুতিতে, কয়েক মিলিয়ন শেয়ার মূল্যহীন হয়ে পড়ে এবং যে বিনিয়োগকারীরা “একটি নির্দিষ্ট মার্জিনে” (ধার করা অর্থ সহ) শেয়ার কিনেছিল তারা পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যায়।

শেয়ার বাজার ক্রাশের পরে যেমন ভোক্তাদের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, তেমনি ব্যয় ও বিনিয়োগের মন্দায় পড়া কারখানাগুলি এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তাদের উত্পাদন কমিয়ে দেয়। সেই সাথে তাদের কর্মীদের ছাটাই করা শুরু করে। যাঁরা যথেষ্ট ভাগ্যবান ছিল, শুধুমাত্র তারাই তাদের চাকরি রক্ষা করতে পেরেছিল। তবে তাদের মজুরি কমিয়ে দেয়া হয়েছিল আশংকা জনকহারে এবং এর ফলে তাদের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছিলো।

অনেক আমেরিকান ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েছিল এ সময়, এবং এসময় বেকারত্তের হার বৃদ্ধি পেয়েছিল ব্যাপকহারে। বিশ্বব্যাপী একটি নির্দিষ্ট মুদ্রা বিনিময়ের দেশগুলিতে স্বর্ণের মানের সাথে বিশ্বব্যাপী, বিশেষত ইউরোপ জুড়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমস্যার প্রভাব ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছিল।

মার্কিন প্রশাসনের তৎপরতা

গ্রেট ডিপ্রেশন (Great Depression) এর সময় রাষ্ট্রপতি হারবার্ট হুভার এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দের আশ্বাস সত্ত্বেও এই সঙ্কটটি অব্যাহত ছিল এবং পরিস্থিতি পরবর্তী তিন বছরে আরও খারাপ হতে থাকে। ১৯৩০ সালের মধ্যে, ৪০ লক্ষ আমেরিকান নাগরিক পুরোপুরি বেকার হয়ে যায় এবং ১৯৩১ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০ লক্ষে।

এ সময়, দেশের শিল্প উত্পাদন অর্ধেক কমে যায়। কৃষকদের ফসল তোলার সামর্থ্য ছিল না, এবং সকলে  অনাহারে থাকলেও তাদের ফসল মাঠেই নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। ১৯৩০ সালে, আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে তীব্র খরার কারণে টেক্সাস থেকে নেব্রাস্কার দিকে প্রবল বাতাস প্রবাহিত হতে থাকে, এটা সাথে করে প্রচুর ধূলিকণা নিয়ে এসেছিল, যার ফলে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়, ফসলের ক্ষেত নষ্ট হয়ে যায়, এবং অনেক পশুর প্রাণহানি ঘটে।

১৯৩০ সালের শুরুর দিকে, ব্যাংকিং খাতে প্রথম আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। কারণ বিপুল সংখ্যক বিনিয়োগকারী ব্যাংকের উপর আস্থা হারিয়েছিলেন এবং নগদ আমানত তুলে ফেলার জন্য ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু, যথারীতি ব্যাংকগুলি তখন তারল্য সংকটে ভুগতে শুরু করেছিলো।

১৯৩২ এবং ১৯৩৩ সালের দিকে ব্যাংকগুলি দেউলিয়া হওয়ার শেষ পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় এবং ১৯৩৩ সালের গোড়ার দিকে হাজার হাজার ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে রুজভেল্ট এর কার্যক্রম

Relief_workers_at_Annerley_during_the_Great_Depression_1938
Relief_workers_at_Annerley_during_the_Great_Depression_1938

রিপাবলিকান সমর্থক হুভার, যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সচিব হিসাবে আগে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে সরকারের সরাসরি অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়, এবং নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়ার দায়িত্বও তাদের নেই।

১৯৩৩ সালে, দেশটি মহামন্দার গভীরতায় ডুবে যেতে শুরু করে এবং প্রায় ১.৫ কোটি মানুষ (তত্কালীন মার্কিন জনসংখ্যার ২০ শতাংশেরও বেশি) বেকার হয়ে পরেছিল। ঠিক এ সময় মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রাথি ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট বিপুল ব্যাবধানে জয় লাভ করেছিলেন।

১৯৩৩ সালের ৪ মার্চ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি রাজ্যর সমস্ত ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছিল যে, মার্কিন ট্রেজারিতে সরকারী কর্মীদের বেতন দেওয়ার মতো নগদ অর্থ ছিল না। তা সত্ত্বেও, এফডিআর (ফ্রাঙ্কলিন ডি রুসভেল্ট, যিনি এই নামে পরিচিত ছিলেন) একটি ধীর স্থির আশাবাদ ব্যাক্ত করেছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে “আমাদের কেবল যেটা ভয় পাওয়ার বিষয় শুধুমাত্র সেটিকেই ভয় পাওয়া উচিৎ”।

রুজভেল্ট দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশাগুলি সমাধানের জন্য তাত্ক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। প্রথমে তিনি চার দিনের “ব্যাঙ্ক ছুটি” ঘোষণা করেন। তিনি মূলত একটি সংস্কার আইন পাস করতে চলেছিলেন, এবং বন্ধ হওয়া ব্যাংকগুলিকে পুনরায় খোলা রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। একাধিক বার রেডিওতে তিনি সরাসরি জনসাধারনের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছিলেন, এর ফলে জনগণের মনে আস্থা অনেকটাই ফিরে এসেছিল।

রুজভেল্ট দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে, তাঁর প্রশাসন একটি আইন পাস করে। এর লক্ষ্য ছিল শিল্প ও কৃষি উত্পাদন স্থিতিশীল করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা।

এছাড়াও, গ্রেট ডিপ্রেশন (Great Depression) দূর করতে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কারের চেষ্টা করেছিলেন, আমানতকারীদের অ্যাকাউন্ট রক্ষা করতে ফেডারেল ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন (এফডিআইসি) তৈরি এবং শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে, সিকিওরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) নামে একটি প্রতিষ্ঠানের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন।

নিউ ডিলঃ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য একটি উপায়

new deal memorial
new deal memorial

গ্রেট ডিপ্রেশন (Great Depression) থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য একটি সমন্বিত প্রকল্পের প্যাকেজ হিসেবে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট “নিউ ডিল” ঘোষণা করেন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা নিউ ডিল (New Deal) এর আওতায় যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিলো তার মধ্যে রয়েছে টেনেসি ভ্যালি অথরিটি (টিভিএ), বন্যা নিয়ন্ত্রণ, দারিদ্র্য বিমোচন এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করেছিল।

একই সাথে দরিদ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত টেনেসি ভ্যালি অঞ্চলে বৈদ্যুতিক শক্তি সরবরাহ শুরু করেছিল। আমেরিকান প্রশাসন, সে সময় একটি স্থায়ী কর্মসূচী গ্রহণ করেছিলো, যার আওতায় ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮৫ লক্ষ মানুষকে নিয়োগ করেছিল বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে।

মহামন্দার (Great Depression) শুরু হওয়ার সাথে সাথে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র শিল্পোন্নত দেশ ছিল। ১৯৩৫ সালে, কংগ্রেস সামাজিক সুরক্ষা আইনটি পাস করে, যা আমেরিকানদের প্রথমবারের মতো বেকারত্ব, প্রতিবন্ধকতা এবং বার্ধক্যের জন্য পেনশনের ব্যাবস্থা করে দিয়েছিল।

১৯৩৩ সালে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সূচনার পরে, পরবর্তী তিন বছর ধরে অর্থনীতিতে উন্নতির ধারা অব্যাহত ছিল। এই সময় আমেরিকার বাস্তব জিডিপি (মুদ্রাস্ফীতির জন্য সমন্বিত) প্রতি বছর গড়ে ৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

ফেডারেল রিজার্ভে অর্থের প্রয়োজনীয়তা মেটানোর লক্ষে, এ খাতে অর্থের সরবরাহ বাড়ানোর ফলে ১৯৩৭ সালে পুনরায় একটি তীব্র মন্দা আঘাত হানে। যদিও ১৯৩৮ সালে অর্থনীতি আবারো উন্নতি শুরু করেছিল, তথাপি এই দ্বিতীয় তীব্র সংকটের ফলে জাতীয় উত্পাদন ও কর্মসংস্থানের সার্বিক চিত্রের পরিবর্তন ঘটে এবং দশকের শেষের দিকে মহামন্দার প্রভাব দীর্ঘায়িত হয়।

মহামন্দা-যুগের প্রভাব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চরমপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্থানকে তীব্র করে তুলেছিল। বিশেষত জার্মানিতে অ্যাডল্ফ হিটলারের নাৎসি শাসনের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো তীব্রতর হচ্ছিলো। জার্মান আগ্রাসনের ফল হিসেবে ১৯৩৯ সালে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। অন্যদিকে, ডব্লিউপিএ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামোকে শক্তিশালী করার দিকে মনোনিবেশ করেছিল, তবে প্রথমদিকে যুদ্ধে না জড়িয়ে দেশটি তার নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছিল।

মহামন্দায় আফ্রো-আমেরিকান এবং মহিলাদের অবস্থা

মহামন্দার (Great Depression) সময়ে ফেডারেল ত্রাণ প্রাপ্ত সকল আমেরিকানদের মধ্যে এক-পঞ্চমাংশ ছিল কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী। কৃষিক্ষেত্র এবং গৃহস্থালীর কাজের ক্ষেত্রে প্রধানত কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়োগ করা হয়েছিল। ১৯৩৫ সালের সামাজিক সুরক্ষা আইনে এদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল না।

এর ফলে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পরেছিল, এবং বিপর্যয় থেকে কাটিয়ে উঠার জন্য তাদের কোন সুরক্ষা জাল ছিল না। যে সমস্ত ত্রাণ কর্মসূচীর আওতায় কৃষ্ণাঙ্গরা এসেছিলো, সেগুলো শুধুমাত্র স্থানীয়ভাবে পরিচালিত কিছু কর্মসূচী ছিল মাত্র।

এতোসব বাঁধা সত্ত্বেও, মেরি ম্যাকলিউড বেথুনের নেতৃত্বে রুজভেল্টের “কালোদের জন্য মন্ত্রিপরিষদ” গঠন করেছিলেন এবং সেখানে নিউ ডিল এর আওতায় একজন কৃষ্ণাঙ্গ উপদেষ্টা নিয়োগ করেছিলেন। পরবর্তীতে রুজভেল্ট সরকারে আফ্রিকান-আমেরিকানদের সংখ্যা তিনগুণ বেড়েছিল।

আমেরিকানদের একটি গ্রুপ ছিল যারা মহামন্দার সময়ে বেশকিছু চাকরির অর্জন করেছিল। এদের বেশীরভাগই ছিল মহিলা। ১৯৩০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত নারীদের সংখ্যা ২৪ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিলো এবং এর সংখ্যা দাঁড়ায় ১০.৫ মিলিয়ন থেকে ১৩ মিলিয়নে। যদিও তারা কয়েক দশক ধরে অবিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলো।

মহামন্দার আর্থিক চাপ নারীদের আরও বেশি পরিমাণে কর্মসংস্থানের দিকে পরিচালিত করেছিল। পুরুষ রুটি বিক্রেতার পরিবর্তে বিভিন্ন স্থানে মহিলাদের দেখা যেত। আমেরিকায় ১৯২৯ থেকে ১৯৩৯ এর মধ্যে বিবাহের হার ২২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিলো। কর্মসংস্থানের সন্ধানে মহিলাদের মধ্যে একাগ্রতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিলো।

গ্রেট ডিপ্রেশন (Great Depression) এর সময় প্রথম মহিলা আইনজীবী হিসেবে এলিয়েনার রুজভেল্ট একজন দৃঢ় চেতনার উকিলের ভুমিকা পালন করেছিলেন। তিনি তার স্বামীর অফিসে কর্মরত মহিলাদের জন্য লবি তৈরি করিয়েছিলেন।  লেবার পার্টির সেক্রেটারি, ফ্রান্সেস পারকিন্স, সর্বপ্রথম মন্ত্রিসভার সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

নারীদের জন্য প্রযোজ্য চাকরিগুলি অন্যান্য চাকুরির তুলনায় কম পারিশ্রমিক পেয়েছিল, তবে ব্যাংকিং সংকটের সময়ে এ অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে এসেছিলো। নার্সিং, শিক্ষকতা এবং গৃহস্থালির কাজে নারীরা বেশি সম্পৃক্ত ছিল। তবে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট এসব ক্ষেত্রে তদারক কারিদের ভূমিকা বৃদ্ধির মাধ্যমে এগুলি নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। 

বিবাহিত মহিলারা একটি অতিরিক্ত বাধার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ১৯৪০ সালের মধ্যে ২৬ টি রাজ্য তাদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র অবিবাহিত নারীদের জন্য নির্ধারিত রেখেছিল। অনেক শ্রমজীবী ​​স্ত্রীরা তাদের  শারীরিকভাবে সক্ষম স্বামীদের কাছ থেকে চাকরি ছিনিয়ে নেবে বলে তারা মনে করেছিল।

তবে বাস্তবতার নিরিখে তারা অবিবাহিত নারীদের প্রাধান্য দিয়েছিলো, কারন এক্ষেত্রে মালিকরা চিন্তা করেছিলো যে, বিবাহিত নারীদের তুলনায় অবিবাহিত নারীদের বেতন কম দেয়া অপেক্ষাকৃত সহজ হবে।

আরও পড়ুনঃ- নিউ ডিল (New Deal) এবং মহামন্দা পরবর্তী মার্কিন ও বিশ্ব অর্থনীতি

মহামন্দা শেষ হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়

 Flickr Schoolchildren line up for free issue of soup and a slice
Schoolchildren line up for free issue of soup and a slice

জার্মানি এবং অন্যান্য অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে রুজভেল্ট ব্রিটেন এবং ফ্রান্সকে সমর্থন করার সিদ্ধান্তের সাথে প্রতিরক্ষা খাতে মার্কিন বিনিয়োগ এবং যুদ্ধ সামগ্রীর উত্পাদন বৃদ্ধি পায়। সেই সাথে আরও বেশি বেশি বেসরকারী খাতের চাকরি বৃদ্ধি পেতে থাকে।

১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে পার্ল হারবারে মার্কিনীদের উপর জাপানি আক্রমণ আমেরিকাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশের দিকে পরিচালিত করে এবং দেশটির কারখানাগুলি পুরোদমে উত্পাদন ফিরে আসে।

এই বিস্তৃত শিল্প উত্পাদন এবং ১৯৪২ সালের শুরুতে ব্যাপক বেকারত্বের হারকে তার প্রাক-হতাশার স্তর থেকে নীচে নামিয়েছে। গ্রেট ডিপ্রেশন (Great Depression) বা মহামন্দা শেষ অবধি শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বৈশ্বিক সংঘাতের দিকে মনোনিবেশ করেছিল।

 

তথ্যসূত্রঃ- https://www.thoughtco.com/the-great-depression-1779289

https://www.history.com/topics/great-depression/great-depression-history

https://en.wikipedia.org/wiki/Great_Depression

https://www.econlib.org/library/Enc/GreatDepression.html

https://www.investopedia.com/terms/g/great_depression.asp

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top